ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিবাসন নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ভিসা প্রক্রিয়ায় কড়াকড়ি, ধীরগতি এবং ক্যাম্পাস ও সীমান্তে অভিবাসী শিক্ষার্থীদের হয়রানির কারণে অনেক বিদেশী দেশটিতে উচ্চশিক্ষা নিতে এখন অনিচ্ছুক। ফলে মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চলতি বছর প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ডলার টিউশন ফি হারানোর আশঙ্কা করছে।
এফটির এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের ১৬২টি বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের অন্তত ১৫ শতাংশই বিদেশী। এতে গবেষণার জন্য বিখ্যাত বড় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে মানবিক বিষয়ে পাঠদান করে এমন ছোট কলেজও রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটাই বিদেশী শিক্ষার্থী নির্ভর হয়ে পড়েছিল।
শিক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠন নাফসা পরিচালিত এক জরিপে দেখা গেছে, তিন-চতুর্থাংশ মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় চলতি বছর বিদেশী শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে। যাদের বেশির ভাগই কমপক্ষে ১০ শতাংশ হ্রাসের কথা বলছে। শিক্ষাবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান শোরলাইট অ্যানালিটিকসের হিসাব অনুযায়ী, বিদেশী শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মোট ৮৬০ কোটি বিলিয়ন ডলার ফি আসে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ কোটি ডলার হারানো মানে বড় অংকের আয় কমে যাওয়া।
এফটির বিশ্লেষণ অনুসারে, যদি সব বিদ্যমান বিদেশী শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও ১০ শতাংশ হ্রাস ঘটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৩০০ কোটি ডলারের বেশি। কারণ ভর্তি ও গড় টিউশন ফি আমলে বিদেশী শিক্ষার্থীরা খরচ করে ২ হাজার ৯৫০ কোটি ডলার।
নাফসার সিনিয়র ইমপ্যাক্ট অফিসার জোয়ান এনজি হার্টম্যান বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি হতাশাজনক ও অনিশ্চয়তায় ভরা। এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত এবং শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় উভয়ের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।’
ফেডারেল সহায়তা পাওয়ার যোগ্য না হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশী শিক্ষার্থীরা সাধারণত পুরো টিউশন ফি পরিশোধ করে। এদিক থেকে তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু বর্তমান অভিবাসন পরিস্থিতির কারণে অনেক শিক্ষার্থী আবেদন জমা দিলেও ভিসা পাচ্ছেন না। অনেকেই অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা শঙ্কার কারণে অন্য দেশে পড়াশোনার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট্রাল মিসৌরির প্রভোস্ট টিম ক্রাউলি জানান, তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৪ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদেশী, যাদের বেশির ভাগই ভারতীয়। তিনি বলেন, ‘বিদেশী শিক্ষার্থীরা আমাদের ব্যবসায়িক মডেলের বড় অংশ। আগামী কয়েক বছর আমাদের মুনাফার পরিমাণ কমে যাবে বলে মনে হচ্ছে।’
আরকানসাসের ইউনিভার্সিটি অব দি ওজার্কসের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী বিদেশী। প্রতিষ্ঠানটির অ্যাডমিশন ডিরেক্টর জোয়ি হিউজ বলেন, ‘আমরা আপাতত আয়ের ঘাটতি সামলাতে পারলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব হতে পারে মারাত্মক।’
রাজনৈতিক ভয়ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প প্রশাসন দাবি করছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অ্যান্টিসেমেটিজম ও কথিত বামপন্থী পক্ষপাত দমন করছে। এ অজুহাতে তারা হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশী শিক্ষার্থীদের পড়ানোর অধিকার বাতিল করেছে, যা বর্তমানে আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হচ্ছে। প্রশাসনের এ পদক্ষেপ ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। কারণ তারা প্রায় পাঁচ হাজার বিদেশী পড়ুয়াকে রেজিস্ট্রেশন থেকে বাদ দিয়েছিল, যদিও পরে সাময়িকভাবে তা ফিরিয়ে নেয়। তারা বহু শিক্ষার্থীকে আটকও করেছে, আবেদনকারীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরো কঠোরভাবে যাচাইয়ের নিয়ম চালু করেছে। এছাড়া মার্কিন প্রশাসন এমন বিশ্ববিদ্যালয়ে করা আবেদন প্রাধান্য দিচ্ছে, যেখানে বিদেশী শিক্ষার্থীর হার ১৫ শতাংশের কম।
চীন, ভারত ও নাইজেরিয়ার মতো দেশ থেকে আগত শিক্ষার্থীরা ভিসা পেতে দেরি ও জরুরি অ্যাপয়েন্টমেন্ট প্রত্যাখ্যানের অভিযোগ করছেন। এতে ইউরোপ, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার কিছু দেশে বিদেশী শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বেড়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পাঠ স্থগিত রাখা, অনলাইন ক্লাস ও বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে গ্রিন কার্ডধারী হলেও অনিশ্চয়তা কাটছে না। ওহাইওর জেভিয়ার ইউনিভার্সিটির প্রেসিডেন্ট কানাডিয়ান নাগরিক কলিন হানিচকে ছুটিতে নিজ দেশে না যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছে তার আইনি পরামর্শক। কারণ ফিরে আসার সময় অভিবাসন জটিলতায় পড়তে পারেন তিনি।
২০১৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা দুই লাখের বেশি বেড়ে ২০২৩ সালে ১১ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছে। তবে বর্তমান সংকট সে প্রবৃদ্ধি থামিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।